
নামাজ হলো ইসলাম ধর্মের প্রধান স্তম্ভের দ্বিতীয় স্তম্ভ। ইসলামে প্রত্যেক নর ও নারীর উপর নামাজ ফরজ। ঈমানের পরই নামাজের অবস্থান। একজন মুসলিম সর্বাবস্থায় নামাজ আদায় করার নির্দেশ রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত করার জন্য এর সঠিক নিয়ম কানুন জানা অত্যন্ত আবশ্যক। এই নিবন্ধে নামাজের কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারীমে এরশাদ করেন :
واقيمواالصلوه واتواالذكوه واركعومع الركعين
সূরা বাকারাহ আয়াত ৪৩
বাংলা অনুবাদঃ ওয়া আকিমুস সালাতা ওয়া তুজ যাকাতা ওয়া আর কাউ মা'আর রাকেইন
বাংলা অনুবাদঃতোমরা সালাত আদায় কর ও যাকাত প্রদান কর এবং রুকু কারীদের সাথে রুকু করো।
আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন :
واقيمواالصلوه واتواالذكوه وما تقدمو الا نفسكم من خير تجدوه عند الله ان الله بما تعملون بصير
সূরা বাকারাহ আয়াত ১১০
বাংলা অনুবাদঃওয়া আকিমুস সালাতা ওয়া তুজ জাকাতা ওমা তুকাদ্দিমা ইল্লা আনফুসিকুম মিন খইর তাজিদুহু ইনদাল্লাহ ইন্নাল্লাহা বীমা তায়ালামুনা বাছির।
বাংলা অর্থঃতোমরা সালাত আদায় কর ও যাকাত আদায় কর,তোমরা উত্তম কাজের যাহা কিছু নিজেদের জন্য পূর্বে প্রেরণ করবে,আল্লাহর নিকট তাহা পাইবে।তোমরা যা কর আল্লাহ তাহার দ্রষ্টা।
আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারীমে এরশাদ করেন :
وذكر اسم ربه فصلى👈
সুরা আলা আয়াত ১৫
বাংলা অনুবাদঃওয়া জাকারাচমা রাব্বিহি ফাসাল্লাহ
বাংলা অনুবাদঃএবং তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করে ও সালাত কায়েম করে
এরকম পবিত্র কোরআন শরীফের ৮১ বা ৮২ আয়াতে আল্লাহ পাক নামাজের জন্য আদেশ করেছেন। সেই নামায কে অবহেলা করার কোন সুযোগ মানুষের নাই। আর এই নামায আদায়ের সঠিক পদ্ধতি ও মাসআলা জানা প্রত্যেক মুসলমানের একান্ত প্রয়োজন।
নামাজের আরকান (ভিতর )ও আহকাম (বাহির )ফরজ সমুহঃ
নামাজের আরকান (ভিতর )ফরজ ০৬ টি যথা :
(১)দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া।
(২)তাকবীরে তাহরীমা পাঠ করা।
কুতাইবা ,হান্নাদ মাহমুদ ইবনে গায়লান (র)...আলী (রাঃ)থেকে বর্ণনা করেন ,রাসূলুল্লাহ (সঃ)এরশাদ করেন, সালাতের চাবি হলো তাহারাত,তাকবীরে তাহরীমা (সালাতের পরিপন্থী )সকল কাজকে হারাম করে আর সালাম হালাল করে। সহীহ তিরমিজি তাহারাত অনুচ্ছেদঃ (০৩)
(৩)কিরআত পাঠ করা।
(৪)রুকু করা।
আব্দুল্লাহ ইব্ন মাসলামা (র) সালিম ইব্ন আব্দুল্লাহ (রাঃ) তার পিতা হতে বর্ণিত যে,রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন সালাত শুরু করতেন,তখন তার উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন।আর রুকুতে যাওয়ার জন্য তাকবীর বলতেন এবং যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন,তখন ও অনুরূপভাবে দুই হাত উঠাতেন এবং سمع الله لمن حمده ও ربنا ولك الحمد বলতেন।কিন্তু সিজদার সময় এরূপ করতেন না। সহীহ বুখারী (৬৯৯)অনুচ্ছেদঃ (৪৭৫)ই ফা বা
(৫)সিজদা করা।
(৬)নামাজের শেষ বৈঠকে তাসাউদ পাঠ পরিমান বসা।
(১)শরীর পাক।
(২)পোশাক পাক।
(৩)জায়গা পাক।
(৪)ছতর ঢাকা।
(৫)কিবলা মুখী হওয়া।
(৬)নিয়ত করা।
(৭)সঠিক সময়ে নামায আদায় করা।
রাসুলুল্লাহ (সঃ)এরশাদ করেন :
আবুল ওয়ালীদ হিশাম ইব্নে আব্দুল মালিক (র:)আবু আমর শায়বানী (র:)থেকে বর্ণিত,তিনি আব্দুল্লাহ ইব্নে মাসুদ (রাঃ)এর বাড়ির দিকে ইশারা করে বললেন,এ বাড়ির মালিক আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে ,আমি রাসুলুল্লাহ (সঃ)কে জিজ্ঞাসা করলাম,কোন আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়?তিনি বললেন ,যথা সময়ে সালাত আদায় করা। ইব্নে মাসুদ (রাঃ)পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, এরপর কোনটি ? তিনি বললেন,এরপর পিতা -মাতার প্রতি সদ্বব্যাবহার।ইব্নে মাসুদ (রাঃ)পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, এরপর কোনটি ?রাসুলুল্লাহ (সঃ)বললেন, এরপর জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ(আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ) ইব্নে মাসুদ (রাঃ)বলেন ,এগুলো রাসুলুল্লাহ (সঃ)আমাকে বলেছেনই,যদি আমি আরো বেশি জানতে চাইতাম,তাহলে তিনি আরও বলতেন।
নামাজের ওয়াজিব ১৪ টি যথাঃ
(১)সূরা ফাতিহা পাঠ করা।
(২)অন্য আয়াত বা সুরা মিলানো।
(৩)রুকু ও সিজদায় দেরি করা(কমপক্ষে এক তাসবীহ বলা পরিমান ).
(৪)রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানো।
(৫) দুই সিজদার মাঝে সোজা হয়ে বসা।(যতক্ষণ সিজদায় ছিলেন )
(৬)দ্বিতীয় রাকাতে বৈঠক বসা।
(৭)উভয় বৈঠকে তাসাউদ পাঠ করা।
(৮)ইমামের জন্য আস্তে বা জোরে কিরাত পাঠ করা।
(৯)বিতর নামাজে দোয়া কুনুত পাঠ করা।
(১০)ঈদের নামাজে অতিরিক্ত ০৬ তাকবীর পাঠ করা।
(১১)ফরজ নামাজে প্রথম দুই রাকাতে কিরআত পাঠ করা।
(১২)নামাযের ফরজ সমূহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
(১৩)নামাযের ওয়াজিব সমূহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
(১৪)সালামের মাধ্যমে নামাজ শেষ করা।
(১)নামাজে অশুদ্ধ কিরআত পাঠ করা।
(২)নামাজের মধ্যে কথা বলা।
(৩)উহ, আহ বা কোঁকানো শব্দ করা।
(৪)সালামের জবাব দেওয়া।
(৫)বিনা প্রয়োজনে কাশি দেওয়া।
(৬)বিপদ বেদনায় শব্দ করে কাদা।
(৭)আমলে কাছীর করা।
(৮)চত্তর খুলে থাকা। (তিন তাসবীহ পরিমান সময় )
(৯)মুক্তাদী ব্যাতিত অন্য লোকের লোকমা গ্রহণ করা।
(১০)নাপাক জায়গায় সিজদাহ দেওয়া।
(১১)নামাজের মধ্যে কিছু খাওয়া বা পান করা।
(১২)সাংসারিক কোন বিষয় চাওয়া।
(১৩)কিবলার দিক হতে অন্য দিকে মুখ ঘুরে যাওয়া।
(১৪)সুসংবাদ বা দুঃসংবাদ এর জবাব দেওয়া।
(১৫)হাঁচির জবাব দেওয়া।
(১৬)নামাজে কোরআন মজিদ দেখে পড়া।
(১৭)ইমামের আগে মুক্তাদির কোন কাজ।
(১৮)নামাজের মধ্যে সালাম দেওয়া।
(১৯)প্রতি রুকনে বেশি চুলকানো।
(২০)শব্দ করে হাসা।
নামাজের সুন্নত সমুহঃ
(১)দুই হাত কাঁধ পর্যন্তু উঠানো।
আব্দুল্লাহ ইব্ন মাসলামা (র) সালিম ইব্ন আব্দুল্লাহ (রাঃ) তার পিতা হতে বর্ণিত যে,রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন সালাত শুরু করতেন,তখন তার উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন।আর রুকুতে যাওয়ার জন্য তাকবীর বলতেন এবং যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন,তখন ও অনুরূপভাবে দুই হাত উঠাতেন এবং سمع الله لمن حمده ও ربنا ولك الحمد বলতেন।কিন্তু সিজদার সময় এরূপ করতেন না। সহীহ বুখারী (৬৯৯)অনুচ্ছেদঃ (৪৭৫)ই ফা বা
(২)হাত বাধা।
আব্দুল্লাহ ইব্ন মাসলামা (র) সাহল ইব্ন সা'দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন,লোকদের নির্দেশ দেওয়া হতো যে,সালাতে প্রত্যেক ডান হাত বাম হাতের কব্জির উপর রাখবে। আবু হাযিম (র) বলেন সাহল (র) এ হাদিসটি নবী (সঃ) থেকে বর্ণনা করতেন বলেই জানি। ইসমাইল( র) বলেন,এ হাদীসটি নবী (সঃ) থেকে বর্ণনা করা হতো। তবে তিনি এরূপ বলেন নি যে ,সাহল (র) নবী (সঃ) থেকে বর্ণনা করতেন।সহীহ বুখারী (৭০৪)অনুচ্ছেদঃ (৪৭৯)ই ফা বা
(৩)ছানা পাঠ করা।
(৪)আউযুবিল্লাহ পাঠ করা।
(৫)বিসমিল্লাহ পাঠ করা।
(৬)সুরা ফাতিহা পাঠ শেষে আমিন বলা।
(৭)উঠা বসার সময় আল্লাহু আকবার বলা।
(৮)রুকুর তাসবীহ পাঠ করা।
(৯)রুকু থেকে ওঠার সময় তাসবীহ পাঠ করা।
(১০) সিজদাহের তাসবীহ পাঠ করা।
(১১)দুরূদ শরীফ পাঠ করা।
(১২)দোয়া মাছুরা পাঠ করা।
আল্লাহ তায়ালা কোরআনুল কারীমে এরশাদ করেন :
واقم الصلوه طر فى النحار وذلفا من اليل ط ان الحسنت يذحبن السيات ط ذلك ذكرى للذكرين
বাংলা অনুবাদঃ ওয়া আকিমিস্সালাতা তারাফাইন্নাহারি ওয়া ঝুলাফাম মিনাল লাইলী ইন্নাল হাসানতিই ইয়ুজ হিবনাস সাইয়াতি যালিকা জিকরা লিজ জাকিরিন
বাংলা অর্থঃ তুমি সালাত আদায় কর দিবসের দুই প্রান্তভাগে এবং রজনীর প্রথমাংশে। সৎকর্ম অবশ্যই অসৎকর্ম মিটিয়ে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে,ইহা তাদের জন্য এক উপদেশ।
মুসাদ্দাদ ইবনে মুসারহাদ...ইবনে আব্বাস (রাঃ)থেকে বর্ণিতঃ।তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ (সঃ)বলেছেন,জিবরাঈল (আঃ)বায়তুল্লাহ শরীফের নিকট দুইবার আমার নামাজের ইমামতি করেন। প্রথমবার আমাকে নিয়ে যুহরের নামাজ আদায় করেন--যখন সূর্য্য পশ্চিম আকাশে সামান্য ঢলে পড়ে এবং সেন্ডেলের এক ফিতা পরিমান সামান্য ছায়া বায়তুল্লাহর পূর্ব দিকে দেখা দিয়েছিলো। অতঃপর তিনি আমাকে নিয়ে আসরের নামাজ আদায় করেন যখন প্রত্যেক বস্তুর ছায়া তার সমপরিমাণ হয়। পরে তিনি আমাকে নিয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন যখন রোজাদার ইফতার করেন। অতঃপর তিনি আমাকে নিয়ে ঐ সময় এশার নামাজ আদায় করেন যখন পশ্চিম আকাশের লাল শুভ্র রং লোপ পায়। পরে তিনি আমাকে নিয়ে ঐ সময় ফজরের নামাজ আদায় করেন --যখন রোজাদার ব্যাক্তির জন্য পানাহার হারাম হয়। পরের দিন তিনি আমাকে নিয়ে যুহরের নামাজ ঐ সময় আদায় করেন--যখন প্রত্যেক বস্তুর ছায়া তার সমপরিমাণ হয়।অতঃপর তিনি আমাকে নিয়ে আসরের নামাজ আদায় করেন-- যখন প্রত্যেক বস্তুর ছায়া তার দ্বিগুন হয়।পরে তিনি আমাকে নিয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন-- যখন রোজাদার ইফতার করেন। অতঃপর তিনি আমাকে নিয়ে রাতের এক-তৃতীয়অংশে এশার নামাজ আদায় করেন। পরে তিনি আমাকে নিয়ে ঐ সময় ফজরের নামাজ আদায় করেন --যখন দিগন্ত উজ্জ্বল হয়ে যায় । অতঃপর তিনি( জিবরাঈল (আ) )আমাকে লক্ষ্য করে বলেন ,ইয়া মুহাম্মদ (সাঃ)!আপনার পূর্ববর্তী আম্বিয়াদের জন্য এটাই নামাজের নির্ধারিত সময় এবং এই দুই সময়ের মাঝখানে নামাজের সময়। (তিরমিজি ,আহমাদ )আবু দাউদ (৩৯৩)
ফজর: সুবহে সাদিক হতে সূর্য উদয়ের আগে পর্যন্ত
যোহর :সূর্য পশ্চিম আকাশে সামান্য ঢলে পড়ার পর থেকে কোন বস্তুর ছায়া তার মূল ছায়ার দ্বিগুন হওয়া পর্যন্তু।
আসর:যোহর ওয়াক্ত শেষ থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্তু।
মাগরিব:সূর্যাস্তের পর থেকে পশ্চিম আকাশে লাল আভা শেষ হওয়া পর্যন্ত।
এশা:পশ্চিম আকাশে লাল আভা শেষ হওয়ার পর উদিত সাদা আভা শেষ হওয়া থেকে শুরু করে সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত।